শখের স্মার্টফোনটি কেনার পর যদি শোনেন সেটি অবৈধ বা আনঅফিশিয়াল, তখন মেজাজ খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। বিটিআরসি (BTRC) এর কড়াকড়ির কারণে এখন ফোন কেনার আগে সেটি আসল না নকল, তা যাচাই করাটা অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে একটি ঝুঁকিহীন ডিভাইস কিনতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই অফিশিয়াল ফোন চেনার উপায়গুলো জানতে হবে।
দোকানদারের মিষ্টি কথায় না ভুলে, নিজেই কীভাবে বুঝবেন আপনার হাতে থাকা ফোনটি অফিশিয়াল নাকি আনঅফিশিয়াল? চলুন জেনে নেওয়া যাক এর কার্যকরী ও পরীক্ষিত পদ্ধতিগুলো।
১. বিটিআরসি (BTRC) ডাটাবেস চেক করুন (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি)
সবচেয়ে সহজ এবং ১০০% নিশ্চিত হওয়ার উপায় হলো বিটিআরসি-র ডাটাবেস চেক করা। বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানিকৃত বা উৎপাদিত প্রতিটি ফোনের তথ্য এই ডাটাবেসে থাকে। এটি যাচাই করতে আপনার ফোনের IMEI নম্বরটি প্রয়োজন হবে।
ধাপ ১: IMEI নম্বর বের করা
ফোনের ডায়াল প্যাডে যান এবং টাইপ করুন *#06#। সাথে সাথে স্ক্রিনে ১৫ ডিজিটের এক বা একাধিক IMEI নম্বর ভেসে উঠবে। যেকোনো একটি (সাধারণত প্রথমটি) কোথাও লিখে রাখুন বা কপি করুন।
ধাপ ২: এসএমএস পাঠানো
মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করুন: KYD <স্পেস> ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বর
উদাহরণ: KYD 123456789012345
ধাপ ৩: ফিরতি মেসেজ চেক করা
মেসেজটি পাঠিয়ে দিন ১৬০০২ (16002) নম্বরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরতি এসএমএস আসবে।
- অফিশিয়াল হলে: মেসেজে লেখা থাকবে— “ডিভাইসটির আইএমইআই (IMEI) বিটিআরসি’র ডাটাবেজে পাওয়া গেছে।”
- আনঅফিশিয়াল হলে: মেসেজে লেখা থাকবে— “ডিভাইসটির আইএমইআই (IMEI) বিটিআরসি’র ডাটাবেজে পাওয়া যায়নি।”
টিপস: স্মার্টফোন কেনার সময় প্যাকেট খোলার আগেই বক্সের গায়ে লেখা IMEI নম্বর দিয়ে এই চেকটি করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
২. বক্সের স্টিকার ও লেবেল দেখুন
একটি অফিশিয়াল ফোনের বক্সে কিছু নির্দিষ্ট চিহ্ন থাকে যা আনঅফিশিয়াল ফোনে সচরাচর পাওয়া যায় না।
- আমদানিকারকের স্টিকার: অফিশিয়াল ফোনে অনুমোদিত আমদানিকারক বা ডিস্ট্রিবিউটরের হলোগ্রাম স্টিকার থাকে (যেমন: Samsung, Xiaomi, Realme এর নিজস্ব অফিশিয়াল সিল)।
- বাংলায় লেবেল: বাংলাদেশে তৈরি বা অ্যাসেম্বল করা ফোনগুলোর বক্সের গায়ে বাংলায় “বাংলাদেশে তৈরি” বা এই জাতীয় তথ্য লেখা থাকে। এছাড়া স্পেসিফিকেশন লেবেলেও অনেক সময় বাংলা ফন্ট ব্যবহার করা হয়।
- বক্সের মান: আনঅফিশিয়াল বা ক্লোন ফোনের বক্সের প্রিন্টিং কোয়ালিটি এবং ফিনিশিং সাধারণত নিম্নমানের হয়।
৩. ওয়ারেন্টি কার্ড যাচাই
অফিশিয়াল ফোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ওয়ারেন্টি। ফোন কেনার সময় বক্সের ভেতরে একটি বৈধ ওয়ারেন্টি কার্ড আছে কিনা তা নিশ্চিত হোন।
- দোকানদার যদি বলে “কোম্পানির ওয়ারেন্টি নেই, আমাদের দোকানের ১ বছরের ওয়ারেন্টি”—তবে বুঝবেন ফোনটি আনঅফিশিয়াল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
- অফিশিয়াল ফোনে ব্র্যান্ডের নিজস্ব সার্ভিস সেন্টার থেকে ১ বছরের পার্টস ও সার্ভিস ওয়ারেন্টি পাওয়া যায়। ইনভয়েস বা ক্যাশ মেমোতে ভ্যাট (VAT) এর পরিমাণ উল্লেখ আছে কিনা তাও দেখে নিন।
৪. দামের পার্থক্য (Price Gap)
বাজারে একই মডেলের ফোনের দুটি ভিন্ন দাম দেখলে সাবধান হন। আনঅফিশিয়াল ফোন সাধারণত অফিশিয়াল ফোনের চেয়ে ৩-৪ হাজার টাকা (কখনো বা আরও বেশি) কমে পাওয়া যায়। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা হয় বলেই এদের দাম কম। “কিছু টাকা বাঁচল”—এই ভেবে আনঅফিশিয়াল ফোন কিনলে ভবিষ্যতে নেটওয়ার্ক জনিত ঝামেলায় পড়ার ঝুঁকি থাকে।
৫. ফোনের সেটিংস থেকে যাচাই (স্মার্ট উপায়)
অনেক সময় বক্স নকল হতে পারে, তাই ফোনের সেটিংস থেকেও কিছু বিষয় দেখে নেওয়া জরুরি।
- Settings > About Phone > Status অপশনে যান। এখানে ফোনের মডেল নম্বর এবং হার্ডওয়্যার ইনফরমেশন দেখুন। গুগলে সেই মডেল নম্বরটি সার্চ করে নিশ্চিত হোন যে এটি গ্লোবাল বা বাংলাদেশি ভেরিয়েন্ট কিনা। চাইনিজ বা ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট হলে সেটি আনঅফিশিয়াল হওয়ার চান্স বেশি।
কেন অফিশিয়াল ফোনই কিনবেন?
অনেকে ভাবেন, আনঅফিশিয়াল ফোন কিনলে তো সমস্যা নেই, টাকা তো বাঁচলো! কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী কিছু সমস্যা আছে:
১. নেটওয়ার্ক সমস্যা: বিটিআরসি-র NEIR (National Equipment Identity Register) সিস্টেম পুরোপুরি চালু হলে আনঅফিশিয়াল ফোনে সিম কার্ড কাজ নাও করতে পারে। ২. রিসেল ভ্যালু: পুরাতন ফোন বিক্রি করতে গেলে অফিশিয়াল ফোনের দাম আনঅফিশিয়াল ফোনের চেয়ে সবসময় বেশি পাওয়া যায়। ৩. নিরাপত্তা: অফিশিয়াল ফোনে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস থাকার ঝুঁকি কম থাকে এবং নিয়মিত সিকিউরিটি আপডেট পাওয়া যায়।
শেষ কথা
স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই সাময়িক লাভের কথা চিন্তা না করে সঠিক নিয়ম মেনে অফিশিয়াল ফোন কেনাই হবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। ফোন কেনার আগে অন্তত একবার KYD লিখে ১৬০০২ নম্বরে এসএমএস করতে ভুলবেন না।
লেখাটি আপনার উপকারে আসলে শেয়ার করে বন্ধুদেরও সচেতন করুন।
Caption Idea Best Caption