ইসলামের বিধানসমূহের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যার হিকমত আমরা কখনো বুঝতে পারি, আবার কখনো তা আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে থেকে যায়। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মেনে নেওয়া, যদিও তার অন্তর্নিহিত কারণ পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব না হয়।
এমনই একটি বিশেষ বিধান হলো— উটের গোশত খাওয়ার পর অজু করা। অন্যান্য হালাল প্রাণীর গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে যেখানে অজু আবশ্যক নয়, সেখানে উটের গোশতের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ নির্দেশ প্রদান করেছেন। কেন এই বিধান? এর পেছনে কী হিকমত রয়েছে? এ বিষয়ে হাদিস ও আলেমদের বক্তব্য আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক উন্মোচন করে।
উটের গোশত খেলে অজু করার নির্দেশ
সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, উটের গোশত খাওয়ার পর অজু করতে হবে।
হজরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত—
أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ: أَأَتَوَضَّأُ مِنْ لُحُومِ الْغَنَمِ؟ قَالَ: إِنْ شِئْتَ فَتَوَضَّأْ وَإِنْ شِئْتَ فَلَا تَتَوَضَّأْ، قَالَ: أَأَتَوَضَّأُ مِنْ لُحُومِ الْإِبِلِ؟ قَالَ: نَعَمْ، فَتَوَضَّأْ مِنْ لُحُومِ الْإِبِلِ
‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, ‘ছাগলের গোশত খেলে কি আমি অজু করব?’ তিনি বললেন, ‘ইচ্ছা করলে কর, আর ইচ্ছা করলে না কর।’ এরপর সে জিজ্ঞাসা করল, ‘উটের গোশত খেলে কি আমি অজু করব?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, উটের গোশত খাওয়ার পর অজু করো।’ (মুসলিম ৩৬০)
অতএব, উটের যেকোনো অংশ— গোশত, চর্বি, কলিজা, নাড়িভুঁড়ি কিংবা অন্যান্য ভক্ষণযোগ্য অঙ্গ খেলে অজু করা আবশ্যক বলে একদল আলেম মত দিয়েছেন। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে কোনো অংশকে এ বিধান থেকে পৃথক করেননি।
যেসব আলেম উটের গোশত খেলে অজু ভঙ্গ হওয়ার মত পোষণ করেছেন
এ মতকে গ্রহণ করেছেন বহু প্রখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
> ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
> ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.)
> ইমাম বায়হাকী (রহ.)
> ইমাম ইবনে খুজাইমাহ (রহ.)
> ইমাম আবু বকর ইবনে মুনযির (রহ.)
এবং আরও অনেক মুহাদ্দিস ও ফকিহ
ইমাম নববী (রহ.) তাঁর মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যায় এ মতের পক্ষে আলেমদের আলোচনা উল্লেখ করেছেন। (শারহু সহিহ মুসলিম, ৪/৪৮-৪৯)
উটের গোশত খাওয়ার পর অজুর কারণ কী?
মূলত এ বিধানের সবচেয়ে বড় কারণ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ। একজন মুসলমানের জন্য এটিই যথেষ্ট। তবে আলেমগণ হাদিসের আলোকে এর কিছু হিকমতও উল্লেখ করেছেন।
১. উটের সঙ্গে শয়তানি প্রভাবের সম্পর্ক
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّهَا خُلِقَتْ مِنَ الشَّيَاطِينِ
‘উট শয়তান থেকে সৃষ্টি হয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ ৭৬৯)
আরেক হাদিসে এসেছে—
عَلَى ذِرْوَةِ كُلِّ بَعِيرٍ شَيْطَانٌ، فَإِذَا رَكِبْتُمُوهَا فَسَمُّوا اللَّهَ
‘প্রত্যেক উটের কুঁজের ওপর একটি শয়তান থাকে। তাই যখন তোমরা উটে আরোহণ করবে, তখন আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) উচ্চারণ করবে।’ (মুসনাদ আহমাদ ২২৭১)
২. ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর ব্যাখ্যা
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন—
‘উটের গোশত খাওয়ার ফলে মানুষের দেহে এক ধরনের শয়তানি প্রভাব সৃষ্টি হয়। আর অজু সেই প্রভাব দূর করে দেয়।’
তার মতে, অজু কেবল বাহ্যিক পবিত্রতার মাধ্যম নয়; বরং এটি আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তিরও একটি উপায়।
৩. শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উছাইমীন (রহ.)-এর ব্যাখ্যা
শায়খ উছাইমীন (রহ.) বলেন—
‘উটের গোশত মানুষের দেহে স্নায়বিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। অজু সেই উত্তেজনা প্রশমিত করতে সহায়তা করে।’ (আশ-শারহুল মুমতি’, ১/৩০৮)
একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি আলোচনা
উটের গোশত খেলে অজু ভেঙে যায়— এ মতটি মূলত হাম্বলি মাযহাব এবং অনেক মুহাদ্দিসের গ্রহণযোগ্য মত। তবে অধিকাংশ হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি ফকিহের মতে, উটের গোশত খেলে অজু ভঙ্গ হয় না; বরং হাদিসে বর্ণিত অজুর নির্দেশকে তারা মুস্তাহাব (উত্তম) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে সকল আলেম একমত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুসরণের মানসিকতা মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
উটের গোশত খাওয়ার পর অজু করার বিষয়টি ইসলামের একটি বিশেষ বিধান, যা সরাসরি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এর পেছনের পূর্ণ হিকমত আল্লাহই সর্বাধিক জানেন। তবে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশকে সম্মান করা এবং তা অনুসরণে আন্তরিক থাকা।
ইসলামের অনেক বিধানের মতো এ বিষয়টিও আমাদের শেখায় যে, ইমান কেবল যুক্তির অনুসরণ নয়; বরং আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্যের নাম। তাই যে বিধানই আসুক, একজন মুমিনের প্রথম পরিচয় হলো—
سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
‘আমরা শুনেছি এবং আনুগত্য করেছি।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮৫)
Caption Idea Best Caption