পবিত্র শবে মেরাজ মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক একটি রজনী। এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছিলেন। আজকের এই নিবন্ধে আমরা শবে মেরাজের তারিখ, ঘটনা, গুরুত্ব এবং এই রাতের আমল সম্পর্কে বিস্তারিত জানব
শবে মেরাজ কত তারিখে ২০২৬?
ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতটি শবে মেরাজ হিসেবে পালিত হয়। চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালে শবে মেরাজ পালিত হওয়ার সম্ভাব্য সময়সূচি হলো:
- ইংরেজি তারিখ: ১৭ই জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার।
- ইবাদতের রাত: যেহেতু ইসলামি বিধান অনুযায়ী সূর্যাস্তের পর নতুন তারিখ গণনা শুরু হয়, তাই ১৬ই জানুয়ারি (শুক্রবার) দিবাগত রাতটিই হবে শবে মেরাজের মূল ইবাদতের রাত।
শবে মেরাজ কী ও কেন?
‘শবে মেরাজ’ ফার্সি শব্দ, যার অর্থ ঊর্ধ্বগমনের রাত। আরবিতে একে ‘লাইলাতুল ইসরা ওয়াল মেরাজ’ বলা হয়। নবুওয়াতের একাদশ বছরে (হিজরতের দেড় বছর আগে) এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটে।
এই ভ্রমণের দুটি অংশ রয়েছে:
১. ইসরা: মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ।
২. মেরাজ: মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করে আরশে আজিম পর্যন্ত ভ্রমণ।
আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত এবং জান্নাত-জাহান্নামের নিদর্শনাবলী রাসূল (সা.)-কে স্বচক্ষে দেখানোর জন্য এবং উম্মতের জন্য নামাজের বিধান উপহার দিতে এই মেরাজ সংঘটিত করেছিলেন।
শবে মেরাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
মেরাজের রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সফরের মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদী বিশেষ কিছু উপহার লাভ করে:
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: এই রাতেই আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। যা মুমিনের জন্য মেরাজ স্বরূপ।
২. ক্ষমার ঘোষণা: আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, এই উম্মতের যারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে না, তাদের কবিরা গুনাহসমূহ (তওবার মাধ্যমে) মাফ করে দেওয়া হতে পারে।
৩. সূরা বাকারার শেষাংশ: এই রাতে সূরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিল হয়।
শবে মেরাজের ঘটনা ও অলৌকিক দৃশ্য
জিবরাঈল (আ.) ‘বোরাক’ নামক বাহন নিয়ে রাসূল (সা.)-কে মক্কা থেকে চোখের পলকে জেরুজালেমে নিয়ে যান। সেখানে তিনি সমস্ত নবীদের ইমামতি করে নামাজ পড়েন। এরপর ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রা শুরু করেন।
ভ্রমণকালে তিনি জান্নাত ও জাহান্নামের কিছু দৃশ্য দেখেন:
- গীবতকারীদের শাস্তি: তিনি দেখলেন, কিছু লোক তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক খামচাচ্ছে। এরা দুনিয়াতে মানুষের গীবত করত।
- সুদখোরদের অবস্থা: তিনি দেখলেন, কিছু মানুষের পেট বিশাল ঘরের মতো বড়, যার ভেতরে সাপ কিলবিল করছে। এরা ছিল সুদখোর।
আল্লাহ ও নবীদের সাথে কথোপকথন
মেরাজের রাতে রাসূল (সা.) বিভিন্ন আসমানে বিশিষ্ট নবীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং মহান আল্লাহর সাথে কথা বলেন।
১. মহান আল্লাহর সাথে কথোপকথন
মেরাজের সর্বোচ্চ স্তর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পেরিয়ে রাসূল (সা.) আল্লাহর দরবারে হাজির হন।
- সেখানে আল্লাহ প্রথমে উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন।
- রাসূল (সা.)-এর বারবার আবেদনের প্রেক্ষিতে তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করা হয়।
- আল্লাহ ঘোষণা দেন, “আমার কথার নড়চড় হয় না। যে ব্যক্তি এই ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, তাকে ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়া হবে।”
২. মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ (ষষ্ঠ আসমান)
মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাতের ঘটনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ যখন প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ দেন, তখন ফেরার পথে মুসা (আ.) রাসূল (সা.)-কে বলেন, “আপনার উম্মত অত্যন্ত দুর্বল, তারা দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং কমানোর আবেদন করুন।” মূলত তাঁর পরামর্শেই রাসূল (সা.) বারবার আল্লাহর কাছে গিয়ে নামাজ ৫ ওয়াক্তে নামিয়ে আনেন।
৩. ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ (সপ্তম আসমান)
সপ্তম আসমানে ‘বাইতুল মামুর’-এ ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি রাসূল (সা.)-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন:
- “আপনার উম্মতকে আমার সালাম দেবেন এবং বলবেন—জান্নাতের মাটি খুব উর্বর এবং পানি খুব মিষ্টি। আর এর চারাগাছ হলো: ‘সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার’।” (তিরমিজি)
৪. আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ (প্রথম আসমান)
প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.) রাসূল (সা.)-কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “নেককার সন্তান ও নেককার নবীর জন্য স্বাগতম।” সেখানে রাসূল (সা.) দেখলেন, আদম (আ.) তাঁর ডানদিকের রুহগুলোকে (জান্নাতি) দেখে হাসছেন এবং বামদিকের রুহগুলোকে (জাহান্নামী) দেখে কাঁদছেন।
শবে মেরাজে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয় আমলসমূহ
শবে মেরাজ উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো ‘ফরজ’ বা ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তবে এই রাতটি ইবাদতের জন্য উৎকৃষ্ট।
- নফল নামাজ: দীর্ঘ সেজদা ও রুকুসহ নফল নামাজ পড়া (যেমন: সালাতুত তাসবিহ)।
- কোরআন তেলাওয়াত: বেশি বেশি কোরআন পাঠ করা।
- ইস্তিগফার ও দরুদ: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং রাসূল (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়া।
- নফল রোজা: রজব মাসের যেকোনো দিন নফল রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ।
বর্জনীয় কাজসমূহ
- ভুল ধারণা: মেরাজের রাতে নির্দিষ্ট সূরায় নির্দিষ্ট রাকাত নামাজ পড়ার যে নিয়ম মানুষের মুখে প্রচলিত আছে, হাদিসে তার কোনো ভিত্তি নেই।
- বিদআত: এই রাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি বা বিশেষ ভোজের আয়োজন করাকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত।
- ভাগ্য রজনী মনে করা: শবে মেরাজ এবং শবে কদর এক নয়। এই রাতে ভাগ্য নির্ধারিত হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
তথ্যসূত্র (রেফারেন্স)
লেখার সত্যতা নিশ্চিত করতে নিচের দলিলগুলো ব্যবহার করা হয়েছে:
১. পবিত্র কোরআন: সূরা আল-ইসরা (আয়াত ১), সূরা আন-নাজম (আয়াত ১-১৮)।
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩২০৭, ৩৮৮৭।
৩. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২ (ঈমান অধ্যায়)।
৪. সুনানে তিরমিজি: জান্নাতের বর্ণনা সংক্রান্ত হাদিস।
উপসংহার: শবে মেরাজ আমাদের শেখায় নামাজের গুরুত্ব এবং আল্লাহর অসীম কুদরত। আসুন, কুসংস্কার ও বিদআত পরিহার করে সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদতের মাধ্যমে এই রাতের বরকত হাসিল করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমিন।
Caption Idea Best Caption